প্রাচীন বাংলা জনপদগুলো বিবরণ

Share This Information

ভূমিকাঃ বাংলার প্রাচীন জনপদসমূহের ভৌগোলিক অবস্থিতি অনেংকাশে, ভূ-প্রকৃতি এবং বিশেষ করে নদীর ¯্রােতধারা দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। প্রাচীন যুগে বাংলা বলতে সমগ্র দেশকে বোঝতে না। এর বিভিন্ন অংশ বিবিন্ন নামে পরিচিত ছিল। নামগুলো বেশিরভাগই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নামানুসারে প্রচলিত নাম। এর ভৌগোলিক পরিমন্ডল প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। আবার রাজনৈতিক ক্ষমতারবিস্তার বা হ্রাসও এদের পরিমন্ডল পরিবর্তন করেছে।



নিম্নে উৎস উল্লেখপূর্বক প্রাচীন জনপদ গুলোর বিবরণ দেওয়া হল।
ক) বঙ্গঃ নিম্নোক্ত উৎস হতে আমরা ‘বঙ্গ’ সম্পর্কে জানতে পারি।
উৎসঃ
১। ঐতরের আরণ্যক।
২। বৌধায়ন ধর্মসূত্র।
৩। রামায়ন কৌটিল্যের ।
৪। অর্থশাস্ত্র।
৫। মহাভারত।
৬। কালিদাসের রঘুবংশ।
৭। দিগি¦জয় প্রকাশ গ্রন্থ। (১৭ শত)
৮। ঐতিহাসিক মিনহাজের বিবরণ।
৯। হেমচন্দ্রের ‘অভিযান চিন্তামনি’ গ্রন্থ।
১০। আর্যমঞ্জশ্রীমূলকল্প।

বঙ্গঃ বঙ্গ প্রাচীনতম জনপদ ঐতরের আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌধায়ন ধর্মসূত্র এ আর্যসভ্যতা বর্হিভূত এবং কলিঙ্গদের প্রতিবেশী হিসেবে বঙ্গ এর উল্লেখ করা হয়েছে। মহাভারতের দিগি জয় অংশে ভীমের পুন্ড্র থেকে বঙ্গদের আক্রমণের কথা বলা হয়েছে। কালিদাসের রঘুবংশ কাব্যে বঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে কছিু তথ্য পাওয়া যায়। গঙ্গার দুই প্রধানত শ্রূত অর্থাৎ ভাগীরযী ও পদ্মার অন্তবর্তী এলাকা যে ত্রিভুজাকৃতি ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে তাই (বঙ্গ) অঞ্চল। অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি সূত্রে সাগর থেকে বহ্মপুত্র পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ ‘বঙ্গ’ বলে বর্ণিত হয়েছে। এই সূত্রে বঙ্গের সীমা দক্ষিণে সুন্দরবাঞ্চলের পূর্বপ্রাপ্ত থেকে উত্তরে ময়মনসিংহ জেলার ব্রহ্মপুত্র প্রবাহ প্রবাহ পর্যন্ত নির্ধারণ করা সম্ভব। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গের বঙ্গের শ্বেত স্নিগ্ধ বস্ত্রের উল্লেখ আছে।

২। পুন্ড্র/পুন্ড্রবর্ধণঃ
জানার উৎসঃ
১। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতীব্দীর মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি।
২। দৈনিক পরিব্রাজক সুয়ান চোয়াং এর বিবরণ।
৩। ভবিষ্য পুরাণ
৪। মৌর্য যুগের শিলালিপি।
পুন্ড্র পূর্বাঞ্চলীয় জনপদসমূহের মধ্যে সুপ্রাচীন নাম। পুন্ড্রবর্ধনের অবস্থিতি অত্যন্ত সুপষ্টভাবে ধরা পড়েছে সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক ভ্রমণকারী হিয়্যেং সাং এর বর্ণনায় পশ্চিমে গঙ্গা (পপ শ্রূত) থেকে পূর্বে করতোয়া পর্যন্ত ভূবাগই পুন্ড্রবর্ধন, ভবিষ্যপুরাণে উল্লেখ আছে যে নিম্নোক্ত সাতটি দেশ পুন্ড্র দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলঃ

১। গৌড়
২। বরেন্দ্র
৩। নীবিতি
৪। সুহ্ম (রাঢ়)
৫। ঋারিখন্ড (সাঁওতাল পরগনা)
৬। বরাহভূমি মোনভূম জিলার বরাভূম)
৭। বর্ধমান।
প্রাচীন তাম্রশাসনেও আছে “পুন্ড্রবর্ধন ভুক্ত্যন্তঃপাতী বঙ্গে বিক্রমপুর ভাগে” অর্থাৎ এককালে পুন্ড্র বর্ধন নামক ভুক্তি স্থিত বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত ভূখন্ডকেই বুঝাত, বগুড়ার সাতমাইল দূরে অবস্থিত মহাস্থানগড়ই প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পন্ডিতেরা অনুমান করেন। কারণ মৌর্য যুগের একটি শিলা লিপিতে এই স্থানটি পুন্ড্র নগরী বলে উল্লেখিত আছে।
১। শ্রীলংকর বৌদ্ধ ঐতিহ্য সংকলিত গ্রন্থ ‘দীপবংশ’ ও ’মহাবংশ’
২। মিনহাজের তাবকাৎ ই নাসিরি।
৩। রাঢ়াঃ

রাঢ়া সম্পর্কে জানার উৎসঃ
৪। চোল সম্রাট রাজেন্দ্র চোলের তিরুমুলাই লিপি বর্তমানের সুপরিচিতি রাঢ়া দেশ
ভাগীরখীর পশ্চিম তীরস্থিত উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়া এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অজয় নদ এই দুইভাগের সীমারেখা ছিল। রাঢ়াভূমি দক্ষিণে দামোদর এবং সম্ভবত রূপনারায়ণ নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মোটামুটি ভাবে একথা বলা যেতে পারে যে, ভাগীরখীর পশ্চিমে তীরে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্তই হয়তো বিস্তৃত ছিল রাঢ়া দেশ।
৪। সুহ্মঃ জানা উৎস
১। পতঞ্জলীর মাহভাষ্য ।
২। পুরাণসমূহ ও মহাকাব্য।
৩। পবনদূত।
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মহাভাষ্যে ‘সুহ্ম’ এর উল্লেখ আছে। মহাকাব্য ও পুরাণসমূহে প্রাচ্যদেশে সুহ্ম এর নাম পাওয়া যায়। ভীমের পূর্বদেশ বিজয়াভিযান থেকে ধারণা করা যায় যে সুহ্ম সমুদ্রোপকূল ও তা¤্রলিপ্তির নিকটবর্তী ছিল। হুগলি জেলার ত্রিবেণী এলাকাই সুহ্মদেশ ছিল বলে পবনদূত সূত্রে অনুমিত হয়। মোটামুটিভাবে সুহ্মদেশ বলতে পশ্চিম বাংরার দক্ষিণাঞ্চলে বুঝাতো। যদিও এর সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
৫। গৌড়ঃ জানার উৎসঃ-
১। পাণিণি সূত্র।
২। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র।
৩। হর্ষচরিত।
৪। রাজতরঙ্গিনী
৫। যাদব বংশীয় রাজা প্রথম জইতুগির মনাগোলি লিপি।
৬। অনর্ঘরাঘব নাটক।
গৌড় নামটি সুপ্রাচীন ও সুপরিচিত হলেও এর অবস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা কষ্টসাধ্য, বাংলার প্রাচীন জনপদসমূহরে যুগে যুগে পরিমÐল সম্প্রসারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গৌড়। এর খ্যাতি এতোই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে সমস্ত বাংলাকেই গৌড়দেশ বলে সময়ে সময়ে আখ্যা দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। সংকীর্ণ অর্থে আদিকালে গৌড় বলতে বর্তমানে মুর্শিদাবাদ জেলা ও মালদা জেলার দক্ষিণাংশকে বোঝাতে। প্রাথমিক পর্যায়ে এর অবস্থিতি ছিল পশ্চিম বাংলার অংশবিশেষ।
৬। বরেন্দ্র উৎসঃ ১। ত্রিকান্ডশেষ অভিধান
২। রামচরিত্র।
৩। মিনহাজের তাবকাৎ ই নাসিরি বরেন্দ্র অথবা রামচরিত কাব্যে বরেন্দ্রীমÐল গঙ্গা ও করতোয়া নদের মধ্যে অবস্থিত বলে বর্ণিত হয়েছে।
৭। স¤্রাটঃ উৎস ১। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশান্তি।
২। কালিদাসের রঘুবংশ কাব্য।
৩। য়ুয়ান চোয়াং এর বিবরণ।
৪। চন্দ্র-দের তা¤্রলিপি।
দক্ষিণপূর্ব বাংলার আর একটি জনপদ সমতট। মেঘনা পূর্ববর্তী অঞ্চলই সমতট বলে পরিচিত ছিল। তবে একেবারে নির্দিষ্ট করে সমতটের সীমা নির্ধারণ সম্ভব নয়। ত্রিপুরা নোয়াখালি অঞ্চলই সম্ভবত প্রাচীন সমতট।
৮। বঙ্গালঃ উৎস ১। দক্ষিণী লিপি।
২। রাজেন্দ্র চোলের তিরুমুলাই লিপি সম্ভবত বঙ্গেই অংশবিশেষ ছিল বঙ্গাল। বঙ্গাল এর ব্যবহার মূলত দক্ষিণী লিপিতে। পন্ডিতগন বঙ্গাল কে বদ্দের অংশ বা সমুদ্র শায়ী দক্ষিণভাগ বা সমস্ত পূর্ব বঙ্গ বলে মনে করেছেন, কিন্তু বঙ্গালের অবস্থিতি নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।
৯। হরিকেলঃ উৎসঃ ১। নবম শতাব্দীর কান্তিদেবের তা¤্রলিপি।
২। চন্দ্রবংশীয় লিপি।
৩। আর্যমঞ্জশ্রীমূলকল্প
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে চট্টগ্রাম অঞ্চলেই হরিকেল জনপদের আদি অবস্থিতি। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থে বঙ্গ সমতট এবং হলিকেল তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু প্রতিবেশী জনপদ বলে উল্লেখিত হয়েছে।



উপসংহারঃ প্রাচীন জনপদ বা ভৌগলিক অস্তিত্বসমূহের কঠিন যুগে যুগে তাদের সীমার বিস্তার ও সংকোচনের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। প্রাচীন যুগে তিনটি জনপদই পুন্ড্র, বঙ্গ ও গৌড় যেন সমগ্র বাংলার সমার্থক হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে অন্যান্য ভৌগোলিক সত্তা একে একে এদের মধ্যেই বিলীন হয়ে পড়েছিল। আবার এর মধ্যেও পুন্ড্র যেন গৌড়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। বাংলার বাইরে বাংলা গৌড় বা বঙ্গ বলেই অভিহিত হয়েছে সপ্তম শতাব্দীর পর থেকে। মুসলমানরা এই দেশ জয় করে সমস্ত প্রদেশটি বঙ্গাল নামে অভিহিত করে।

Share This Information