শশাংকের কৃতিত্ব বা রাজ্য বিস্তার ।

Share This Information

ভূমিকাঃ বঙ্গদেশের ইতিহাসে শশাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনিই প্রথম রাজা যাঁর রাসীমা বঙ্গদেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিলেন। ড. বি. সি সেন খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে অষ্টম শতাব্দী মধ্যভাগ পর্যন্ত সময় সীমাকে বঙ্গদেশের ইতিহাসে “ব্যর্থও যুগ” বলে অভিহিত করেন। এই ব্যর্থতার মধ্যে একমাত্র সার্থক ব্যক্তি ছিলেন গৌড়রাজ শশাংক।
শশাংককে বাংলার ইতিহাসের প্রথম স্বাধীন নরপতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। লিপিমালা স্বাধীন নরপতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। লিপিমালা এবং অবিহিত করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সিংহাসনে আসীন ছিলেন। অর্থাৎ তিনি কীর্তিমান শাসকদের মধ্যে অন্যতম শাসক ছিলেন।

শশাঙ্কের সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্যঃ পূর্বভারতে শশাংকের অভ্যুদয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদিও শশাঙ্কের অভ্যুদয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদিও শশাংকের রাজসভায় কোন সাহিত্যিক ছিলেন না। তবুও বিরোধী পক্ষের রচনা থেকে শশাংক সম্পর্কে জানা যায়। হর্ষের সভাকবি বানভট্ট এর হর্ষচরিত গ্রন্থে এবং চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর রচনা থেকে শশাংক সম্পর্কে জানা যায়। ড. আর সি মজুমদারের মতে এই সকল লেখকেরা ছিলেন পক্ষপাত-দুষ্ট কারণ বাণভট্ট ও হিউয়েন সাং দুজনই হর্ষের আশ্রিত। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ আর্যমমঞ্জশ্রীমূলকল্প এবং ৮ম ও ১০ম রাজ্যাংকে প্রকাশিত দুটি লিপি, গঞ্জামের তাম্রশাসন, হষবর্ধনের বাশখেরা ও মধুবন তাম্রশাসন এবং কামরূপের রাজা ভাস্করমর্ণের নিধনপুর তাম্রশাসন থেকে এবং উৎকীর্ণ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা হতে শশাংক সম্পর্কে জানা যায়। শশাংক সম্পর্কে জানার জন্য এসব উপাদান ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।



শশাংকের বংশপরিচয়ঃ শশাংকের বংশপরিচয়, তাঁর উত্থান ও জীবনের কাহিনী আজও পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় নি। কেননা তাঁর আমলের সমস্ত উপাদান পাওয়া গেছে তাতে বহু বিপরীত মূখী বর্ণনা রয়েছে। তবে কিছু কিছু মুদ্রা থেকে তার বংশপরিচয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু যেগুলো ছিল অস্পষ্ট।
যশোহরে প্রাপ্ত কিছু মুদ্রা থেকে জানা যায় ‘নরেন্দ্রগুপ্ত পাঠান্তরে ‘নরেন্দ্রাদিত্য’ খোদাই আছে। যেহেতু গুপ্ত সম্রাটরা ‘আদিত্য’ কথাটি ব্যবহার করত সেহেতু ধারণা করা হয় শশাংক গুপ্ত বংশীয় ছিল। তবে এ তথ্যের কোন প্রত্যক্য প্রমাণ ছিলনা বলে ড. রায় চৌধুরী এ মতকে অগ্রাহ্য করেন।
ড. আর ডি ব্যানার্জির মতে. শশাংক ছিলেন পূর্ববর্তী গুপ্ত বংশের সন্তান। আবার ধারণা করা হত তিনি মহায়েস পুপ্তের পুত্র বা ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন বলে মনে করা হয় কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে অভাবে এমতামতটি ও অস্পষ্ট।
আর. জি বসাকের মতে, শশাংক গৌড়ের রাজা জয় নাগের বংশধর। কিন্তু বেশীরভাগ পÐিত মনে করেন। শশাংক ছিলেন গুপ্তবংশীয় মহাসেন গুপ্তের সামন্ত। নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে শশাংকের বংশপরিচয় স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হয় নি। তবে অনেকে মনে করেন শশাংক বাঙালী ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ শশাংকের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে। ধারণা করা হয় মহাসেন গুপ্তের সামন্তরূপে শশাংক তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।
সসারাম জেলার অন্তর্গত রোটাস গড় গিরিদূর্গে “শ্রী মহাসামন্ত শশাংক নাম পাওয়া গেছে, ধারণা করা হয় এই শশাংক এবং গৌড়রাজ শশাংক যদি একই ব্যক্তি হন করেছিলেন। অধ্যাপিকা দেবাহুতির মতে, শশাংক মৌখরী গণের অধীন ছিলেন। আবার ড.বি,সি সেন তাঁকে সম্ভবত অবন্তিবর্মনের অধীন বলেছেন। ড. ডি,সি গাঙ্গুলী এই মতের সমর্থক। ড. মজুমদার তাঁর গ্রন্থে এ সম্পর্কে তাঁর মত দৃৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছেন অবন্তিবর্মন মগধ শাসন করেছিলে তার কোন প্রমাণ নেই অন্যদিকে মহাসেন গুপ্ত নিশ্চিত ভাবে তা করে ছিলেন। যেহেতু অধিকাংশের মতে মহাসেন গুপ্তের সামন্ত ছিল বলে ধরে নেওয়া হয় যেহেতু ধরে নেওয়া হয় তিনি সামন্তরূপে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করে একের পর এক রাজ্য জয় করতে থাকেন।

রাজ্য জয়ঃ শশাংক মোটামুটিভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন বলে ধারণ করা হয়। সম্ভবত ৬০৬ খ্রিঃ শশাংক রাজা সিংহাসনে বসেন।
গৌড়ের সিংহাসনে বসারপর উত্তর ও পশ্চিম বাংলার কিছু অংশ তিনি গৌড়ের অন্তভূক্ত করেন। গৌড়ে তাঁর অধিকার স্থাপন করে প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজ্যবিস্তার শুরু করেন। তিনি দন্ডভুক্তি (মেদিনীভুক্ত) রাজ্য, উড়িষ্যার রাজ্য এবং বিহারের মগধ রাজ্য জয় করে তার রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন। পশ্চিমে তার রাজ্য বারণসী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

রাজধানীঃ শশাংকে গৌড়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাঁ রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে ছয় মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত রাঙামাটির নিকট কানসোনা। হিউয়েন সাং এর ভাষার শশাংকের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ নগরে রক্তমৃত্তিকা বিহারে বিহারে অবস্থিত ছিল।

উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গ জয়ঃ উত্তর এবং পশ্চিম বঙ্গ নিঃসন্দেহে তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সামন্তমহারাজ সোমদত্ত এবং মহাপ্রতিহার শুভকীর্তির মেদিনীপুর লেখতে শশাংককে ‘অধিরাজ’ বলা হয়েছে। রাজ্য বিস্তারের প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে প্রাকৃতিক সীমা তথা উত্তরে-হিমালয়, পশ্চিমে শোন-গÐক এসব প্রাকৃতিক সীমা লাভের চেষ্টা করেন। সম্ভবত মগধ প্রথম থেকেই তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শশাংকের উপাধিঃ শশাংকের এগরা তা¤্রশাসন থেকে জানা যায় তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব সূচক পরমদৈতক, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ, পরমমাহেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। সোমদত্তের পরিবর্তে শ্রীশশাঙ্গ দেব উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন।

মৈত্রীজোট গঠনঃ শশাংকের বৈদেশিক মূলনীতি লক্ষ ছিল মৌখরিদের হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষা করা। মৌখরীগণ তখন খানেশ্বরের পুষ্যভূতির বংশের সঙ্গে মৈত্রীসম্পর্ক স্থাপন করে তাদের শক্তি সুদৃঢ় করেছিল। গৃহবর্মন মৌখরীর সঙ্গে পুষ্যভূতি বংশের প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীর বিবাহ ছাড়া ও এমৈত্রীর পিছনে রাজনৈতিক কারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থ কাজ করেছিল। শশাংক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং কাজ তার সম্প্রদায় ঘটিয়ে মৌখরীদের মনে আতংকের সৃষ্টি করেছিলেন। শশাংক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্টা করেন এবং দ্রুত তার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে মৌখরীদের মনে আতংকের পক্ষে শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজন ছিল। শশাংকের ভবিষ্যৎ সম্ভবানা উজ্জ্বল না থাকলেও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুযোগ গ্রহণ করে নিজের অবস্থাকে আয়ত্তে¡ আনেন। তিনি কুটনৈতিক সুত্রে মালচররাজ দেবগুপ্তের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে স্বীয় শক্তিাকে বৃদ্ধি করেন। থানেশ্বর রাজের অসুস্থতার সুযোগে দেবগুপ্ত তাঁকে আক্রমণ করেন এবং স্ত্রীকে বন্দী করেন।
বিশ্বাস উৎপাদন করে তাঁকে নিহত করেন। হিউয়েন সাং ও বানভট্টের সাথে একমত পোষণ করেন। যেহেতু তারা হর্ষবর্ধনের আশ্রিত ছিলেন যেহেতু তাদের তথ্য নির্ভর যোগ্য নয়। ড. মজুমদার বলেন, রাজ্যবর্ধন শশাংকের ন্যায় যুদ্ধে নিহত করেন। রমা প্রসাদ চন্দ্রের মতে, রাজ্যবর্ধন সম্ভবতঃ শশাংকের কাছে আত্মসমর্পন করেন অথবা বন্দী হন । ড. মজুমদারের মতে, বানভট্ট ও হিউয়েন সাং এর বিবরণে বহু অসঙ্গগতির আলে। হর্ষবর্ধনের শিলালিপিতে বলা হয়েছে, সত্যানুরোধে রাজ্যের ধন শত্রু ভবনে প্রাণত্যাগ করেন। উপরের তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনেক ঐতিহাসিক শশাংকের বিশ্বাস ঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের দোষে দোষী করে রাজ্যবর্ধনের হত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এ জন্য শশাংককে গৌড়াধর্ম ও গৌড়পাষÐ বলে আখ্যয়িত করেন। ড, ডিসি গাঙ্গুলী ও অধ্যাপিকা দেবাহুতি প্রভৃতি শশাংকের চরিত্রে বাণ বা হিউয়েন সাং কলঙ্ক লেপন করবেন এটা মনে করা যায় না। দেবাহুতির মতে বাণ ও হিউয়েন সাং এর রচনায় অসমকালীন প্রমাণ গুলির ওপর নির্ভর করা উচিত । এগুলো ভুল ত্রæটি দেখিয়ে উচিত নয়। সমকালীন যুগের নৈত্তিক মানদÐ অনুসারে শশাংক এমন কিছু গর্তিত কাজ করেননি।

শশাংক হর্ষ সম্পর্কঃ রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর তার কণিষ্ট ভ্রতা হর্ষ থানেশ্বরের সিংহাসনে বসে শশাংকের বিরুদ্ধে য্দ্ধু যাত্রা করার জন্য গৌড়ের শত্রæ কামরুপের রাজা ভাস্করবর্মার সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন। এর ফলে শশাংক দুদিক থেকে পূর্বে কামরূপ, পশ্চিমে পুষ্যভূতি দ্বারা আক্রান্ত হন। বানের বিবরণ হতে এই যুদ্ধের ফলাফল জানা যায় নি। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প মতে, শশাংককে হর্ষ পরাজিত করেন। এবং তাকে নিজ রাজ্যে আবদ্ধ করেন। কিন্তু এর তথ্য তেমন নির্ভরযোগ্য নয়। আবার হিউয়েন সাং হর্ষবর্ধন কর্তৃক শশাঙ্কের বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধনের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করেননি তবে এ কথা বলেন। অন্য এক চীনা পরিব্রাজক সিইউকি এর বিবরণে হর্ষবর্ধণ কর্তৃক শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা কথা উল্লেখ আলেছ কিন্তু উবয়ের পত্যক্ষ সংঘর্ষের উল্লেখ নাই।



শশাঙ্কের অবনতিঃ শশাংকের রাজত্বের শেষের দিকে মুদ্রগুলোর মান খুব নিচু ছিল। এর থেকে তার আর্থিক অবনতির কথা জানা যায়। ধারণা করা হয়, হর্ষের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে তার শক্তি ক্ষয় পেয়েছিল। ৬২৯খ্রিঃ মেদিনীপুর লিপি থেকে জানা যায় যে, শশাংক এ সময় তাঁর মহারাজধিরাজ উপাধি পরিত্যাগ করেন।

শশাঙ্কের মৃত্যুকাল পর্যন্ত ক্ষমতার অক্ষুন্নতাঃ স্মিথ ড.মজুমদারের মত প্রভৃতি ঐতিহাসিক মনে করেন যে, শশাঙ্ক যদি কোন যুদ্ধে হর্ষের কাছে পরাজিত হন তবে তাঁর তেমন কোন ক্ষতি হয় নি। শশাংক জীবিত কালে তার রাজ্যসীমা অক্ষুন্ন ছিল। হিউয়েন লাভ বলেছেন যে, শশাংকের মৃত্যুকাল পর্যন্ত (৬৩৭ খ্রি) মগধের উপর তাঁর অধিকার বহাল ছিল। মা তোয়াললিন নামক চীনা লেখক ও হিউয়েন সাং এর কথার প্রতিধ্বনি করেছে লেখক হর্ষ দ্বারা গৌড় আক্রমণ ও শশাংকে পরাজিত করার কথা উল্লেখ না থাকায় অনুমান করা হয় যে, শশাংক পূর্ণ গৌরবে মৃত্যুকাল পর্যন্ত শাসন করেন।
শশাংকের ৬১৯ খ্রিঃ গজ্ঞাসে রাজত্ব করতেন। বোধিগয়ার বোধিবৃক্ষ ছেদন থেকে প্রমাণিত হয় যে, ৬৩৭ খ্রি. শশাংক রাজত্ব করতেন।

শশাংকের ধর্মঃ শশাংকের নামাঙ্কিত মুত্রাসমূহে দেখা যায় মুদ্রার এক পৃষ্ঠে শিব ও বৃষের মূর্তি এবং অপরপৃষ্ঠে গজ লক্ষ¥ীমূর্তি খোদিত আছে। এ থেকে বৃথা যায়, শশাংক শৈব ধর্মের ছিলেন।
বৌদ্ধ বিদ্বেষঃ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ গুলিতে শশাংকের বৌদ্ধ বিদ্বেষের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিউয়েন মাঙ শশাংকের বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী কার্য কলাপের বিবরণ দেন। বানের রচনার শশাংকে গৌড়াধর্ম গৌড়ভুজঙ্গ বলা হয়েছে। মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল। তিনি বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষ ছেদন করেছেন।
শশাংকের বৌদ্ধ নীতি সম্পর্কে আধুনিক বিচারভুক্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যাঃ ড. চন্দ্রের মতে. শশাংক রাজ নৈতিক কারণে হয়ত বৌদ্ধ নির্যাতন করতেন। বৌদ্ধ সম্্রাট হর্ষের প্রতি বৌদ্ধদের পক্ষপাতের জন্য হয়ত শশাংক একাজ করেছিলেন। সম্ভবত শশাংকের বৌদ্ধ নির্যাতনের কাহি মধ্যে অতিশয়োক্তি আছে। শশাংকের সময়ে বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হাতে। ড. নীহার রঞ্জনের মতে, বাংলার অর্থনীতি বৌদ্ধরাই সাহায্যে করা থেকে বিরত থাকে। মোট কথা, নিছক ধর্মীয় গোড়ামীর বশে শশাংক বৌদ্ধ নির্যাতন করেন এ কথা মনে করা যায় না। যাই হোক শশাংকের বৌদ্ধ বিদ্বেষের ফলে বৌদ্ধধর্মের খুব ক্ষতি হয়েছিল এমন কথা বলা যায় না।
শশাংকের কৃতিত্বঃ সপ্তম শতকে বাংলার ইতিহাসে গৌড়াধিপ শশাংক আকস্মিক উল্কাপিন্ডের মত উদিত হয়ে আলো ছড়িয়ে দেন। ড. মজুমদারের মতে, “শশাংক তাঁর পাল রাজারা এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। জোরে ভারত ইতিহাসের পাদপ্রদীপের সামনে এসে দাঁড়ান। গৌড়াধিপ শশাংকই সর্বপ্রথম ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
গর্বিত কনৌজের মৌখরী বংশকে ধ্বংস করেন, পূর্বভাগে ভাস্করবর্মাকে পদানত করে শশাংক তাঁর বিজয়রথ ছুটিয়ে দেন। দক্ষিণে গঞ্জাম পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে তিনি বাংলাকে প্রাকৃতিক সীমান্ত পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। কনৌজ-গৌড় সংগ্রামের পত্তন করে তিনি পরবর্তী যুগে পাল রাজাদের পথ-নিদর্শন দিয়ে যান।

শাসনব্যবস্থাঃ শশাঙ্ক শুধুমাত্র দুঃসাহসিক অভিযানকারী ছিলেন না। তাঁর শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বিশদ কিছু জানা গেলেও তাঁর প্রভাহিতৈষীমনা কমছিল মনে করা যায় না। রাজধানী কর্ণসুবর্ণ তাঁল আমলে সম্পদময়ী হয়ে ওঠেছিল। তিনি শুধু গৌড়দেশের মর্যাদা গঠনের আয়োজনও করেন। মেদিনীপুরের দাঁতন বা দন্ডভুক্তি অঞ্চলে দিঘী জলসেচ ব্যবস্থা জণ্যে তা প্রচেষ্টার সাক্ষ্য দেন।

মূল্যায়নঃ শশাংকের মূল্যায়নের মূল্যায়নের সময় আমাদের মনে রাখা উচিত যে, তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক উপাদান বেশী নেই এবং যা আছে তা তাঁর বিরোধী পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া। তবুও রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে তাঁর জীবন যে সাফল্য মন্ডিত হয়েছে। তাতে কোন সন্দেহ নেই। মহারাজ শশাংক ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসক হয়ে ও বিস্তৃণ রাজ্যের অধিপতী হয়েছিলেন নিজের বুদ্ধি ও সাহসের বলে। শশাংক কীর্তিমান নরপতি ছিলেন সন্দেহ নাই। তাকে জাতীয় নায়ক অথবা বীর বলা যেতে পারে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও তিনি সমবেত শক্তি (কনৌজ-থানেশ্বর-কামরূপ) বিরুদ্ধে সার্থক সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র নবপতিরূপে সুবিস্তৃত রাজ্যের অধিকারী হয়েছিলেন।

উপসংহারঃ শশাংককে নিঃসন্দেহে সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি বলা যায়। বালার ইতিহাসে তিনিই প্রথম শাসক যিনি সা¤্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি যে সা¤্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন, তারই উপর পাল যুগের রাজারা সৌধ নির্মাণ করেছিলেন। ড. মজুমদার বলেছেন যে, শশাংকের যদি জীবনীকার থাকত। তাহলে হয়ত হর্ষবর্ধনের মতো উজ্জ্বল মনে হত।

Share This Information